কলেজে পড়ার সময় একদিন রিকশায় কোনো এক ছেলে ওড়না ধরে
দিয়েছিল টান। কাঁদতে কাঁদতে ক্লাসে ম্যাডামকে নালিশ করতেই ধমক—রিকশায় হুড
তুলে বসতে পারো না? আর ওড়না গুছিয়ে পরতে পারো না তোমরা?
আরও পরে
বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সামনে এক সন্ধ্যায় বন্ধুরা মিলে আড্ডা দেওয়ার সময়
কয়েকটা ছেলে মোটরবাইক তুলে দিচ্ছিল প্রায় গায়ের ওপর। প্রভোস্টকে জানাতে
তিনি উল্টো চোখ পাকালেন—এত রাতে তোমরা বাইরে কী করছিলে শুনি? সন্ধ্যা
থাকতে থাকতে হলে ফিরতে পারো না?
এবারের পয়লা বৈশাখে ঢাকা
বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে মেয়েদের যৌন হয়রানির ঘটনার পর যখন চারদিকে
তুমুল আলোচনা, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক তরুণী লিখছিলেন তাঁর এই
অভিজ্ঞতাগুলো। শেষে লিখেছিলেন, প্রতিবারই দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে আমাকে।
আমাকেই বলা হয়েছে ‘দস্যি, বেয়াদব, বেপর্দা, অশালীন, অসভ্য’! কিন্তু আর না।
যদি বলো কেন শাড়ি পরেছ, কেন কপালে দিয়েছ টিপ, কেন গিয়েছ ওই ভিড়ে, ওই
দঙ্গলের মধ্যে, কেন থাকতে পারো না ঘরের ভেতর গুটিয়ে—তবে চিৎকার করে বলব,
বেশ করেছি। আরও যাব। হাজারবার যাব। আবার শাড়ি পরব, টিপ দেব। খোলা আকাশের
নিচে ছুটব। হুড খোলা রিকশায় বৃষ্টিতে ভিজব। অনেক সয়েছি তোমাদের
চোখরাঙানি, আর না। আর না।
শুধু কি তাই, বাড়ির মধ্যে উচ্চ স্বরে কথা
বললে, জোরে হাসলেও শোনা যায়, মেয়েদের অত জোরে হাসতে নেই। এত কিসের হাসি।
যখন-তখন বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতার কথা না-হয় বাদই দিলাম।
অপরাধী কে, শাস্তি কার?‘কোনো
নারী যখন শিকার হয় যৌন নির্যাতনের, তখন মূল অপরাধীকে আড়াল করতেই যেন
নানা রকম ধুয়া আর বাহানা ওঠে।’ বললেন লাকী আক্তার, রাজনৈতিক কর্মী। বলা হয়,
কেন সে এমন পোশাক পরল, কেন সে ভিড়ের মধ্যে যায়, কেন সে বাসে ওঠে
ঠেলাঠেলি করে ইত্যাদি ইত্যাদি। লাকী আক্তার বললেন, ‘এতে অপরাধীরা আরও বেশি
আশকারা পেয়ে যায় এবং ঘটনাগুলো আবার ঘটতেই থাকে। এর মূল কারণটা হলো এই
বিচারহীনতার সংস্কৃতি। এ ধরনের ঘটনার কোনো দিন কোনো বিচার হয় না, আর
বিচার হয় না বলেই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ একে সহজ ও স্বাভাবিক ব্যাপার বলেই
ধরে নিয়েছে।’ দৃষ্টিভঙ্গির কথা যদি বলা হয়, লাকী মনে করেন, দৃষ্টান্তমূলক
শাস্তি বা বিচার হলে সামাজিক এই দৃষ্টিভঙ্গিও ধীরে ধীরে পালটাবে। যে মা
অন্যের অপরাধের জন্য নিজের মেয়েকে দোষী করেন বা নিরাপত্তার নামে ঘরে আটকে
রাখতে চান—তিনিও তখন সোচ্চার হবেন, প্রতিবাদী ও সাহসী হয়ে উঠবেন। তাই এখন
চাই কঠোর ও চলমান প্রতিবাদ, আন্দোলন। যাতে প্রতিটি ঘটনার জন্য দায়ী
পুরুষগুলোর শাস্তি হয়। কেবল তখনই সমাজের এই দোষারোপের দৃষ্টিভঙ্গি
পালটাবে।
পোশাক কি নারীকে নিরাপত্তা দেয়?নারী যে পথেঘাটে
নিগৃহীত হয়, তার জন্য কি নারীর পোশাক, সাজগোজ বা চলাফেরাই দায়ী?
সাম্প্রতিক ঘটনায় নানা মন্তব্য আর সমালোচনায় আবারও নারীকেই পরোক্ষভাবে
দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু পথ চলতে, এমনকি বর্ষবরণের এ ঘটনায় শাড়ি পরা নারীও
রেহাই পায়নি, এমনকি যখন নির্যাতনের শিকার হয় শিশুরা, তখন এই প্রশ্নের উত্তর
মেলে না।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা
বিভাগের অধ্যাপক গীতি আরা নাসরীন বলেন, ‘সমাজে নারীকে ভোগ্যবস্তু বলেই মনে
করা হয়। যৌন হয়রানিকে পুরুষের একটি স্বাভাবিক আচরণ হিসেবে ধরে নেওয়া
হয়েছে বলেই যখন নারীর ওপর যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, তখন তার দায় ভিকটিমের
ওপরই চাপানো যায়। অর্থাৎ যৌন নিপীড়নকে অপরাধ বলে গণ্যই করা হয় না।
নিপীড়কের শাস্তি হয় না এবং নিপীড়িত হলে নারী বিচার পাওয়ার বদলে বরং
কলঙ্কিত হয়। ফলে পরিবারে মেয়েটিকেই তখন সামলে চলতে শিক্ষা দেওয়া হয়, তার
অংশগ্রহণের পথ রুদ্ধ করা হয়।’
এ ধরনের একটি নিপীড়নমূলক অবস্থাকে চলতে
দিলে নারী কখনোই নিরাপদ থাকবে না। যৌন নিপীড়ন যে একটি অপরাধ, সেটি
শ্রেণিকক্ষে শিক্ষা দিয়ে, গণমাধ্যমে প্রচার করে এবং অপরাধীকে শাস্তি দিয়ে
জনমানসে আনা দরকার। গীতি আরা নাসরীন মনে করেন, অভিভাবকদেরও উচিত মেয়েকে নয়,
বরং ছেলেসন্তানকেই শিক্ষা দেওয়া, যাতে সে যৌন নিপীড়ন না করে,
বন্ধুবান্ধবকে উৎসাহ না দেয় এবং এমন ঘটনার সম্মুখীন হলে অবশ্যই প্রতিবাদ
করে।
আমরা দুর্বার‘আমরা সকাল বিকাল রাত্তিরে, পা রাখব
বাইরে, কাজে অকাজে’। বর্ষবরণের দিনে কলঙ্কিত ঘটনার পর লন্ডনভিত্তিক নাট্যদল
কমলা কালেকটিভ পরিবেশন করেছে এ গান। গানের কথায় আছে, ‘...আমরা প্রবল, আমরা
দস্যি, আমরা দুর্বার, আমরা কলঙ্ক। আমরা মনোহারী, আমরা ভীষণ দুষ্কৃতকারী।
বেঁধে রাখো চোখ, লিঙ্গ—দুটোই বাঁধো।’
সন্ধ্যার পরে বাইরে যেয়ো না,
চুল খোলা রাখলে কুনজর পড়ে, মেয়েরা হচ্ছে ঘরের লক্ষ্মী—জন্মের পর থেকেই
মেয়েদের সামাজিক সংস্কারসাধন (কন্ডিশনিং) শুরু হয়ে যায়। এ যে কেবল আমাদের
মতো দেশে ঘটে, তা নয়। এর প্রকারভেদ দুনিয়াজুড়ে বিরাজমান বলে উল্লেখ করলেন
কমলা কালেকটিভসের সদস্য অভিনয়শিল্পী লিসা গাজী। তিনি বলেন, ‘গত পয়লা বৈশাখে
নারী নির্যাতনের যে ভয়াবহ রূপটি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি, তারই জবাবে আমি
“আমরা দুর্বার” এই গানটি লিখি এবং আমাদের আর্টস কোম্পানি কমলা কালেকটিভের
আরেক প্রতিষ্ঠাতা সদস্য সোহিনী আলমকে গানটির ওপর কাজ করার দায়িত্ব দিই।
পরবর্তী সময়ে আনান সিদ্দিকা ও অলিভার উইকসকে নিয়ে সোহিনী আলম গানটি সুরারোপ
ও বিন্যাসের কাজ করেন। ল্যাঙহ্যাম অ্যান্ড স্ট্যানমোর ফিল্মস ভিডিওটি ধারণ
করে। আমরা আশা নিয়ে গানটি বাঁধি—“নিপীড়নের ভয়ে দুয়ার বন্ধ রাখব না,
লাঞ্ছনার কাছে নিজের স্বকীয়তা, স্বাধীনতার বিসর্জন দিব না। আগামী উৎসবে,
কাজে, পার্বণে, খেলায়, আনন্দে আমাদের উপস্থিতি দ্বিগুণ হব!”’
.এটি
মোটেও নারীর জন্য নতুন কোনো ভয়াবহতা নয়। হাঁটতে গেলে, কাজে গেলে, মেলায়
গেলে, বাজারে গেলে আমাদের গায়ে কেউ হাত দেবে, আমাদের প্রতি অশ্রাব্য ভাষায়
মন্তব্য ছুড়বে, অশ্লীল অঙ্গভঙ্গি করবে; এহেন লাঞ্ছনার ভেতর দিয়ে যাওয়া
আমাদের জীবনের অংশ হয়ে ওঠে, আমরা মেনে নিতে শিখি—এমনটাই মত লিসা গাজীর।
তিনি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘চলুন, আমাদের ছেলেসন্তানকে আমরা ছোটবেলা থেকেই
গুরুত্বের সঙ্গে যেকোনো মেয়েকে সম্মান করতে শেখাই আর মেয়েকে বলি স্বাবলম্বী
হতে। মেয়েকে বলি নারীর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন, লাঞ্ছনা কোনো অবস্থাতেই
গ্রহণযোগ্য নয়।’
লিসারও জন্মের ১০০ বছর আগে লিখেছেন বেগম রোকেয়া,
‘অশিক্ষিত অমার্জিত রুচির পুরুষেরা বিনা শৃঙ্খলে থাকিবার উপযুক্ত নহে।
আপনারা কী রূপে তাহাদিগকে মুক্তি দিয়া নিশ্চিন্ত থাকেন?’
নারী, পুরুষ,
বৃদ্ধ, শিশু—সবাই মিলেই ভাবি, অপরাধী কে, দোষী ও দায়ী কারা, কাকে বাঁধতে
হবে, কাকে দিতে হবে শাস্তি? অন্য কথা না বলে সেদিকে মনোনিবেশ করাটাই কি
উচিত নয় এখন?
ভাবুন তো, মেয়েরা নির্বিঘ্নে হেঁটে যাচ্ছে রাস্তায়। তার
হাসির কলকল শব্দে চারদিক ভরে যাচ্ছে। কোনো পুরুষই তার দিকে লোভাতুর
দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে না…সে স্বাধীন…। মানুষ হিসেবে এতটুকু তো চাইতেই পারে।