অন্তঃসত্ত্বা মনীষার সামনে ঘোর অন্ধকার

মনীষার চোখেমুখে ঘোর অন্ধকার। কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। কিসে কী হয়ে গেল। এক দিন আগেও ঘরে ছিল ভরপুর আনন্দ। মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে সব ওলটপালট। তছনছ হয়ে গেছে মনীষার সব স্বপ্ন। গর্ভে তার সাত মাসের সন্তান। আর কয়েক দিন পরেই আলোর মুখ দেখবে সে। বড় হবে এই আলো-বাতাসে। কিন্তু কোনো দিনই পাবে না বাবার স্নেহ। গর্ভে থাকতেই সে পিতাকে হারাল। তার পিতা ছাত্রদল নেতা নুরুজ্জামান জনি গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন। একটি দু’টি নয়, ১৬টি গুলির ক্ষত জনির শরীরে। পুলিশের দাবি জনি ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। কিন্তু পরিবারের দাবি, জনিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। মনীষার জিজ্ঞাসা, ‘কেন আমার স্বামীকে এভাবে হত্যা করা হলো? কী তার দোষ? রাজনীতি করাই কি তার অপরাধ?’ আরো অনেক প্রশ্ন। দুই দিন ধরে মনীষার আর্তনাদ বন্ধ হচ্ছে না। শুধুই বিলাপ করছেন স্বামীর জন্য। অনাগত সন্তানের ভবিষ্যৎ চিন্তায় শুধুই বের হয়ে আসছিল দীর্ঘশ্বাস।

সোমবার বিকেলে মনীষাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা ছিল জনির। মনীষার সাথে সোমবার বেলা সোয়া ১১টায় মোবাইলে জনির কথা হয়। জনি তখন বলেছিলেনÑ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে আটক ছোট ভাই হীরাকে দেখতে গেছেন তিনি। মইন তার সাথে আছে। মইন ওই পরিবারের পূর্বপরিচিত। মইন নিজেও ছাত্রদলের রাজনীতির সাথে জড়িত। জনি বলেছিলেন, তিনি জেল গেটের পাশে আছেন। ফিরেই স্ত্রীকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে যাবেন। বেলা ৩টায় কল দিয়ে জনির ফোন বন্ধ পান তিনি। এর মধ্যে জনির মোবাইল থেকে একটি খুদে বার্তা আসেÑ ‘কল মি আর্জেন্ট’। তাৎণিকভাবে জনির ফোনে কল দেন তিনি। কল কেটে দেয়া হয়। তারপর থেকে ফোন বন্ধ। মনীষা জানান, তখনই মনে হচ্ছিল খারাপ কিছু ঘটেছে। ওই অসুস্থ শরীর নিয়ে তিনি জেল গেটে ছুটে যান। স্বামীর খোঁজে ছুটে বেড়ান এখানে সেখানে। সারা রাত ঘুমাতে পারেননি মনীষা। পুরো পরিবারই ওই রাতে সজাগ। অজানা আশঙ্কায় রাত পার করেছেন তারা। সূর্য ওঠার আগেই তাদের সেই আশঙ্কা বাস্তব রূপে হাজির। মঙ্গলবার খুব ভোরে তারা জানতে পারেন জনি আর নেই। ২০১২ সালের ২৩ নভেম্বর নুরুজ্জামান জনির সাথে বিয়ে হয় মুনিয়া পারভিন মনীষার। সে থেকে আনন্দেই তাদের সংসার কাটছিল। বাবা-মা, ভাইবোন ও স্ত্রীকে নিয়ে যৌথ পরিবারে ছিল বসবাস।

জনির সাথে তার মা নিলুফা বেগমের কথা হয় সোমবার বেলা ১টায়। জনি জেলগেটে জেনে তিনি সাথে সাথে তাকে সেখান থেকে সরে যেতে বলেছিলেন। জনি বলেছিল, চিন্তা কোরো না মা। আমি বাইরে আছি, কিছু হবে না। কে জানত ওটাই ছেলের সাথে তার শেষ কথা! তিনি জানতে চান, ‘আমার ছেলে কি সন্ত্রাসী, তাকে কেন ডিবি মেরে ফেলল?’ নিহত জনির বুকে, পিঠে, কোমরে ও পায়ে ১৬টি গুলির ক্ষত পাওয়া গেছে। হাসপাতাল সূত্র ও সুরতহাল রিপোর্টে এ তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। জনির পরিবারের দাবি খুব আক্রোশ নিয়ে পুলিশ তাকে গুলি করেছে। না হলে বন্দুকযুদ্ধ হলে তার শরীরে এত গুলি লাগবে কেন? নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই এলাকার একাধিক নিরাপত্তারক্ষী জানিয়েছেন, রাতে তারা অনেক গুলির শব্দ শুনেছেন। ভেবেছেন, অবরোধকে কেন্দ্র করে কোনো ঘটনা ঘটতে পারে। ভয়ে কেউ রাস্তায় বের হননি। পরে তারা জানতে পারে পাশেই জোড়পুকুরপাড় এলাকায় একটি লাশ পড়ে আছে। তারা জানান, রাতে কান্নার শব্দ শুনেছেন। ‘মা’ ‘মা’ বলে কয়েকটি চিৎকার শুনেছেন। বাঁচার আকুতি শুনেছেন। এরপর নিস্তব্ধতা।

জনির পিতা ইয়াকুব আলী অভিযোগ করেন, ছাত্রদল করার কারণেই তার ছেলেকে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করা হয়েছে। ছাত্রদলের খিলগাঁও থানার সাধারণ সম্পাদক হওয়ার কারণে ওই এলাকায় নাশকতা হলেই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হতো। তিনি বলেন, জনি কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিল না। চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, কেউ তার ছেলেকে সন্ত্রাসী প্রমাণ করতে পারলে নিজের হাতের কব্জি কেটে ফেলবেন। তবু কেন তাকে হত্যা করা হলো? জনির পরিবারের সদস্যরা জানান, কয়েক দিন ধরেই জনিকে খুঁজছিল ডিবি পুলিশ। জনিকে আটক করার জন্য গত শুক্রবার তাদের তিলপাপাড়ার বাসায় অভিযান চালায় ডিবি। এ সময় জনিকে না পেয়ে তার ছোট ভাই মনিরুজ্জামান হিরাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়। সোমবার হিরাকে দেখতে ছাত্রদল কর্মী মইন হোসেনকে সাথে নিয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারে যান জনি। সেখান থেকেই জনি ও মইনকে গ্রেফতার করে ডিবি। জনির মামা দেলোয়ার হোসেন জানান, জনিকে না পেয়ে তারা খিলগাঁও থানা ও ডিবি অফিসে খোঁজ নেন। ওইদিন জনিকে আটকের বিষয়টি তারা কেউ স্বীকার করেনি। জনির মামাতো ভাই মাসুদ রানা জানান, জনির বিরুদ্ধে গাড়ি পোড়ানোর অভিযোগে পুলিশের দেয়া মামলা ছাড়া আর কোনো মামলা ছিল না।

নিহত ছাত্রদল নেতা জনির বিরুদ্ধে ছয়টি মামলা রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। এর মধ্যে ২০১৩ সালের ২৯ আগস্ট ও একই বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর দায়েরকৃত দু’টি মামলার এজাহারে তার নাম নেই। বাকি চারটি মামলার মধ্যে গত বছরের ২৫ মে, ২৪ এপ্রিল ও তার আগের বছরের ২৯ আগস্ট দায়েরকৃত তিনটি মামলা বিস্ফোরক দ্রব্য আইনে দায়ের করা হয়েছে। এ ছাড়া, গত বছরের ৩১ মে সহিংসতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা রয়েছে।

জনির লাশ তিলপাপাড়া জামে মসজিদের পাশে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায় জনির বাড়িতে তালা। বাড়ির নিচে যে দোকানগুলো রয়েছে, তাতেও তালা। পুরো এলাকায় শুমশাম নীরবতা। মঙ্গলবার রাত ১১টা পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাঁচটি গাড়ি ছিল জনির বাড়ির সামনে। জনির এক চাচা বলেছেন, পরিবারের সদস্যদের নানাভাবে হুমকি দেয়া হচ্ছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তারা চরম আতঙ্কে আছেন।

জনির পরিবারের খোঁজ নিলেন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ

নিজস্ব প্রতিবেদক জানান, পুলিশের সাথে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত খিলগাঁও থানা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান জনির বাসায় গিয়ে তার পরিবারের স্বজনদের খোঁজ নিলেন বাংলাদেশ সম্মিলিত পেশাজীবী পরিষদের নেতৃবৃন্দ। গতকাল দুপুরে নিহত নুরুজ্জামান জনির খিলগাঁওয়ের বাসায় যান এবং তার কবর জিয়ারত করেন পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ। পরে তারা জনির অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলে খোঁজখবর নেন এবং ধৈর্য ধারণের কথা বলেন। সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক রুহুল আমিন গাজীর নেতৃত্বে এ সময় অন্যদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রোভিসি অধ্যাপক ড. আ ফ ম ইউসুফ হায়দার, মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: মোর্শেদ হাসান খান, ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) রফিকুল ইসলাম বাচ্চু, প্রকৌশলী হারুন প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

জনির পরিবারের সদস্যরা পেশাজীবী নেতৃবৃন্দকে বলেন, পুলিশের গোয়েন্দা সদস্যরা (ডিবি) নুরুজ্জামান জনিকে গুলি করে হত্যা করেছে। কারণ সে ছাত্রদলের রাজনীতি করতে বলে। জনির বিরুদ্ধে খিলগাঁও এলাকায় কোনো ধরনের অভিযোগ নেই। তাকে সবাই ভালোভাবে চিনত। কিন্তু প্রতিহিংসাবশত তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। পরে পেশাজীবী নেতৃবৃন্দ জনি হত্যার ঘটনায় তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়ে হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।
  • 0Blogger Comment
  • Facebook Comment

Post a Comment